মানুষের ইতিহাস

আউট অফ আফ্রিকা প্রায় দুই লাখ বছর আগে আফ্রিকার সাভানায় জন্ম নিয়েছিল আধুনিক মানুষ, হোমো স্যাপিয়েন্স। সেই সময় পৃথিবীতে শুধু তারাই ছিল না; আরও কয়েকটি মনুষ্য প্রজাতি ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল পৃথিবীর ভিন্ন ভিন্ন প্রান্তে। ইউরোপে ছিল শক্তপোক্ত গড়নের হোমো নিয়ানডারথালেনসিস বা নিয়ানডারথাল মানুষ। অন্যদিকে মধ্য এশিয়ার গুহায় বাস করত রহস্যময় ডেনিসোভানরা, আর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় টিকে ছিল ক্ষুদ্রকায় হোমো ফ্লোরেসিয়েনসিস। বৃহত্তর মনুষ্য পরিবারে তখন ছিল বেশ কয়েকটি প্রজাতির মানুষ। আফ্রিকা ছেড়ে হোমো স্যাপিয়েন্সরা যখন উত্তর ও পূর্ব দিকে যাত্রা শুরু করল, তখন তাদের সামনে এসে দাঁড়াল এই অন্য মানুষগুলো। ইউরোপের শীতল গুহায় তাদের দেখা হলো নিয়ানডারথালদের সাথে। এরা ছিল শক্তিশালী, বলিষ্ঠ, কিন্তু সংখ্যায় কম। মধ্য এশিয়ার পাহাড়ি উপত্যকায় স্যাপিয়েন্সরা মুখোমুখি হলো ডেনিসোভানদের। এটা শুধু প্রতিযোগিতা বা যুদ্ধের গল্প নয় বরং এক অদ্ভুত মিশ্রণেরও কাহিনি। আধুনিক জেনেটিক গবেষণায় দেখা যায়, সেই সাক্ষাতে ঘটেছিল জিনের আদান-প্রদান। নিয়ানডারথালদের সাথে স্যাপিয়েন্সদের মিলনের ফলে আজকের ইউরোপীয় ও পশ্চিম এশীয় মানুষের শরীরে এখনো ১–২% নিয়ানডারথাল জিন পাওয়া যায়। আবার ডেনিসোভানদের সাথে স্যাপিয়েন্সদের মেলামেশায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জের মানুষের শরীরে আজও টিকে আছে প্রায় ৪–৬% ডেনিসোভান জিন। এই জিনগুলো অনেক ক্ষেত্রেই উপকারী, যেমন তিব্বতের মানুষের উচ্চভূমিতে অক্সিজেনের স্বল্পতায় বেঁচে থাকার ক্ষমতা এসেছে ডেনিসোভানদের কাছ থেকেই। তাহলে প্রশ্ন জাগে, যদি এত জিনের আদান-প্রদান হয়, তবে অন্য হোমো প্রজাতিগুলো কেন বিলুপ্ত হয়ে গেল? এর উত্তর বহুমাত্রিক। একদিকে হোমো স্যাপিয়েন্সরা ছিল সংখ্যায় অনেক বেশি, তাদের ছিল সামাজিক বন্ধন, ভাষা আর সহযোগিতার শক্তি। তারা শিকার করত দল বেঁধে, আগুন ব্যবহার করত দক্ষতার সাথে, আর নানা পরিবেশে খাপ খাইয়ে নিতে পারত সহজে। অন্যদিকে নিয়ানডারথাল বা ডেনিসোভানরা ছিল তুলনামূলকভাবে সীমিত অঞ্চলেই আবদ্ধ। জলবায়ুর পরিবর্তন, খাদ্যের সংকট, আর হোমো স্যাপিয়েন্সেদের সাথে প্রতিযোগিতা তাদের ধীরে ধীরে বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দিয়েছিল। তবুও তারা পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। আমাদের শরীরে তাদের কিছু জিন আজও বেঁচে আছে, অতীতের অদৃশ্য স্মৃতি হয়ে। পৃথিবীতে শেষ পর্যন্ত টিকে রইল কেবল একটি মানব প্রজাতি - হোমো স্যাপিয়েন্স। আফ্রিকার বুক থেকে বেরিয়ে তারা ছড়িয়ে গেল ইউরোপ, এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা পর্যন্ত। এই দীর্ঘ যাত্রাপথে শুধু ভাষা বা সংস্কৃতি বদলায়নি, বদলেছে তাদের শরীরের গড়নও। আফ্রিকার তপ্ত সাভানায় খোলা আকাশের নিচে ঘুরে বেড়ানো মানুষদের সূর্যের তীব্র রশ্মি থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্য তাদের ত্বক রয়ে গেল গাঢ় রঙের; এটা যেন এক প্রাকৃতিক ঢাল। আবার যখন তাদের একাংশ উত্তরের শীতল আর মেঘলা ইউরোপে পৌঁছাল, তখন সীমিত সূর্যালোক থেকে শরীরের ভিটামিন-ডি তৈরি করার জন্য ত্বক ধীরে ধীরে ফর্সা হতে শুরু করল। আরেকদল যখন পূর্ব এশিয়ার তুষারঢাকা সমতলভূমিতে পৌঁছাল, সেখানে বরফে প্রতিফলিত আলোর ঝলকানি ও প্রবল বাতাস চোখের জন্য অস্বস্তিকর হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তখনই মানুষের চোখে গড়ে উঠল অতিরিক্ত ভাঁজ, যাকে আমরা আজ এপিকান্থিক ফোল্ড বলে জানি, এটাও প্রকৃতির তৈরি এক বিশেষ সুরক্ষা। নাকও বদলালো পরিবেশের সাথে। উত্তরের হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় শ্বাসের আগে বাতাস গরম করার জন্য নাক হলো সরু আর লম্বাটে; আবার উষ্ণমণ্ডলে নাক হলো চওড়া, যাতে সহজে বাতাস চলাচল করতে পারে। মানুষের এইসব বাহ্যিক রূপান্তর হাজার হাজার বছরের ধীর পরিবর্তনের ফল। সময়ের সাথে সাথে পৃথিবীর প্রতিটি ভূখণ্ড মানুষের শরীরকে নতুন করে গড়ে তুলেছে। যার ফলে তৈরি হয়েছে মানুষের আজকের রঙ, মুখাবয়ব আর চোখের গঠনের বৈচিত্র্য। কিন্তু সবকিছুর পেছনে লুকিয়ে আছে সেই প্রাচীন মহাযাত্রার গল্প, এক মহাকাব্যিক কাহিনি—আউট অফ আফ্রিকা। যে গল্পের শেষে আধুনিক মানুষ শুধু টিকে থাকেনি, বরং পৃথিবীর প্রতিটি কোণে নিজের ছাপ রেখে গড়ে তুলেছে আজকের বৈচিত্র্যময় মানবজাতি। From তানভীর হোসেন 27/08/2025

Comments

Popular posts from this blog

ধর্ম নিয়ে

Banglar atit