মনোরঞ্জন ব্যাপারীর

https://www.facebook.com/share/1CGu5LJySP/ https://www.facebook.com/share/1CGu5LJySP/লেখাটা একটু বড়ো। না পড়লে কিছু হবে না। তবে পড়লে আপনার লোকসান হবে না বলেই আমার বিশ্বাস। বাবাসাহেব ভীমরাও রামজি আম্বেদকরের প্রতিকৃতিতে মাল্যদানের মধ্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গ দলিত সাহিত্য আকাদেমির তিন দিবসীয় [১৭/১৮/১৯ নভেম্বর-২৫] সাহিত্য সম্মেলন নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়েছে। ৭০টি পত্র পত্রিকা এবং প্রায় ৪০০ জন দলিত কবি লেখক আলোচক অংশ করেছিলেন এই সাহিত্য সম্মেলনে।এই সব কিছুর মধ্য দিয়ে আমরা চেষ্টা করেছি দলিত সমাজের শিক্ষিত কিছু জনকে কঠোর বাস্তবতার দিকে চোখ ফেরাতে। আজকে বঙ্গ জীবনের দ্বারপ্রান্তে এমন একটা ভয়াবহ সময় এসে উপস্থিত হয়েছে যে দলিত জীবন বিদ্ধস্ত বিপন্ন করে দেবার মনুবাদী সমস্ত আয়োজন প্রায় সম্পুর্ন হয়ে গেছে। মাত্র দিন কয়েকের অপেক্ষা তারপরই তাঁরা হিংস্র জঘন্য মানবতা বিরোধী, দলিত সংহারক-কোটি প্রান বলিদানের মহাযজ্ঞ প্রারম্ভ করবার নিখুঁত ব্যবস্থাপনা শুরু করে দেবে। যার প্রথম ও প্রধান বলি হবে বঙ্গের নমশূদ্র সমাজ।এই সমাজ ব্রাম্মন্যবাদী মনুবাদীদের কাছে অসহ্য একটি জনগোষ্ঠি ।যাঁদের ধ্বংস বিদ্ধস্ত না করে দিতে পারলে তাঁদের বিজয় রথ যে কোন সময়ে মুখ থুবরে পড়বার সম্ভাবনা আছে। বন্ধুরা আপনারা নিশ্চয় জানেন যে দেশে অনেক আদিবাসী জনগোষ্ঠি আছে। কিন্ত আদিবাসী সমাজের কথা এলেই আমাদের সর্বাগ্রে যে সমাজের কথা মনে পড়ে যায় সেটা মুণ্ডা ও সান্থাল সমাজ।কারন অন্য জনজাতির তুলনায় এই জাতি শিক্ষা দীক্ষায় অনেকটা এগিয়ে আসতে পেরেছিল ও ইংরেজের বিরুদ্ধে এই সমাজের মানুষ এক সাহসিক লড়াই লড়েছিল। অনুরূপভাবে যদি বঙ্গের দলিত সমাজের কথা আসে ৯০টি দলিত গোষ্ঠির মধ্যে নমশূদ্র পৌণ্ড্র ক্ষত্রিয় রাজবংশী সমাজকে সবার শীর্ষে রাখতে হয়। এঁরা শিক্ষা দীক্ষায় অর্থনৈতিকভাবে অন্যান্য দলিত গোষ্ঠির চাইতে বেশ কিছুটা এগিয়ে যেতে পেরেছে।যার মধ্যে নমশূদ্র মানুষদের অবশ্যই এক নাম্বার স্থান প্রাপ্য । তুল্যমূল্য বিচারে নম মানুষদের মনুবাদ তথা ব্রাম্মন্যবাদ বিরোধী ভুমিকা বেশ পুরাতন এবং এটি একটি সঙ্ঘবদ্ধ শক্তিশালী সাহসিক জাতি হিসাবে পরিচিত।এমন শোনা যায়,সেই বারোভুঁইয়ার শাসনামলে এঁরা এদের পরম্পরাগত অস্ত্রঢাল সড়কি নিয়ে দ্বিগবিজয়ী বীর আলেকজান্ডারের সেনা বাহিনীর অগ্রগমনের সামনে বাধার পাহাড় হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। যে কারনে আলেকজান্ডারকে বঙ্গ বিজয় অসমাপ্ত রেখে ফিরে যেতে হয়েছিল। সেই নীল আন্দোলনের সময়ে এঁরা এক নীলকর সাহেবকে নীলের কড়াইয়ে ফেলে সেদ্ধ করেছিল। তেভাগা আন্দোলনেও এদের ভুমিকা অতি উল্লেখ্যনীয় ছিল। চৈতন্য পরবর্তী সময়ে এই জাতির মধ্যে হরিচাঁদ বিশ্বাস নামে একজন সমাজ সংস্কারকের জন্ম হয়েছিল।যিনি বেদবিধি-ব্রাম্মন্যবাদী বিচার ধারার বিরুদ্ধাচারন করে মতুয়া নামে একটি নতুন ধর্মমতের স্থাপনা করেছিলেন।যে কারনে মতুয়া ভক্তগন তাঁকে ঠাকুর উপাধিতে ভূষিত করেন। পরবর্তী সময়ে এই জাতির মধ্যে জন্মগ্রহন করেন যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল। ব্যারিষ্টার এই মানুষটি ছিলেন অবিভক্ত বাংলার অবিসংবাদী এক নেতা। যিনি অসংরক্ষিত আসনে প্রতিদন্ধিতা করে আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। এই একটি কারনে উচ্চবর্ন নিম্নবর্ন মুসলমান- সমস্ত মানুষের মধ্যে তাঁর গ্রহনযোগ্যতা কতখানি ছিল সেটা প্রমানিত হয়। যে সময়ে যোগেন্দ্রনাথ মন্ডলের অভ্যুদয় সেই একই সময়ে মহারাষ্ট্রে আর এক দলিত নেতার আবির্ভাব ঘটে। তিনি ভীমরাও রামজি আম্বেদকর। বিদ্বান বাগ্মী স্বজাতি দরদী এই মানুষটির জন্য সে সময়ে মনুবাদীদের নাভিশ্বাস উঠে গিয়েছিল। তাঁরা চাইছিল যে কোন প্রকারে আম্বেদকর সাহেবকে নির্জীব নিস্কৃয় করে দিতে। তখন ভারতবাসীদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে ইংরেজ শাসকরা দেশে ফিরে যাবার তোড়জোড় শুরু করেছে।ভারতভুমির শাসনকার্য পরিচালনার জন্য তখন ভারতবাসীর প্রয়োজন পড়বে একটি নিজস্ব সংবিধানের। সে সংবিধান সভায় যেতে হলে সর্বাগ্রে তাঁকে একটি নির্বাচনে জয় লাভ করে আসতে হবে। সেই উদ্দেশ্যে আম্বেদকর সাহেব মুম্বাই থেকে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। কিন্ত তাঁকে তো ওই সভায় যেতে দেওয়া যাবেনা। গেলে দলিতদের জন্য এমন বিধি বিধান সংযুক্ত করবে যাতে দেশে দলিত উত্থান আর আটকে রাখা যাবেনা। সেই ভয় ভাবনা থেকে কংগ্রেস আম্বেদকর সাহেবের বিরুদ্ধে তীব্র প্রচার শুরু করে। যার ফলে তিনি সেই নির্বাচনে পরাজিত হয়ে যান। আম্বেদকর সাহেবের পরাজয়ে উল্লাস প্রকাশ করে সেই সময় কংগ্রেস নেতা বল্লভভাই প্যাটেল বলেছিলেন, সংবিধান সভার দরজা তো অনেক দূরের কথা আম্বেদকরের জন্য আমরা ওই ভবনের জানালা পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়েছি। বাংলার নমশূদ্র নেতা যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল বুঝেছিলেন ওই মানুষটির সংবিধানসভায় যাওয়া কত জরুরী। উনি দলিতদের জন্য যা করতে পারবেন অন্য কোন নেতা তা পারবে না। তাই তিনি আম্বেদকর সাহেবকে বাংলায় ডেকে নিয়ে আসেন। এবং খুলনা থেকে নির্বাচনে জিতিয়ে সংবিধান সাভায় যাবার পথ প্রশস্ত করে দেন। আজ সারাদেশে দলিতদের যে উন্নয়ন উন্নতি, শিক্ষা চাকরি রাজনীতি সব কিছুতে এত আধিপত্য আম্বেদকর সাহেব সংবিধান সভায় যেতে না পারলে কিছুতে সম্ভব হতোনা। আর যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল না থাকলে উনি যেতেও পারতেন না। এই কারনে কংগ্রেস বা মনুবাদী সমস্ত নেতাদের যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল ও নমশূদ্র মানুষের উপর এত রাগ ক্রোধ। তাঁরা এ নিয়ে বার বার ভাবনা চিন্তা করেছে। কি ভাবে নম আর মাহার ঐক্যে ভাঙ্গন ধরানো যায় তাঁর পরিকল্পনা করেছে। এই জুটিতে ভাঙ্গন না ধরাতে পারলে আগামীদিনে মনুবাদীদের অনেক বড় চ্যালেঞ্জের সামনে পড়তে হবে সেটা বুঝেছে। সেই সুযোগটা তাঁদের নাগালে এসে গেল দেশ বিভাজনের কারনে। অনেকে দেশভাগের জন্য জিন্নাকে দোষারোপ করে। তবে ইতিহাসের ছাত্র মাত্রেই জানেন একা জিন্না নয় অনেক হিন্দু রথী মহারথীও মনেপ্রানে দেশ ভাগ চাইছিলেন। যার মধ্যে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর নামও আসবে। বস্তত এরাও নয় বহু পূর্ব – সেই ১৮১৮ সাল থেকেই একদল এমন ভাবনা চিন্তার বিষ ছড়াচ্ছিল যে হিন্দু মুসলমান কিছুতে একসঙ্গে থাকা সম্ভব নয়। যার মধ্যে রমেশচন্দ্র মজুমদার থেকে শুরু করে কথিত নব জাগরনের অনেক পুরধাও ছিলেন। সে সব নিয়ে বিস্তারিত লিখতে গেলে লেখার কলেবর বেড়ে যাবে।তবে এটা সত্যি যে এই দেশভাগের কারনে এক ঢিলে তিন তিনটে পাখি মারা সম্ভব হয়ে গিয়েছিল। ১, দেশভাগ না হলে অবিভক্ত বাংলার লোকসভার আসন সংখ্যা ১০০ থেকে ১২০ টার মত হতো।তাহলে আর গোবলয়ের হিন্দিভাষী নেতাদের এত দাপাদাপি চলত না। প্রধানমন্ত্রী অর্থ ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সব হতো বাঙালির মধ্য থেকে কেউ একজন।বাংলাভাগ তাঁদের সেই বিপদ থেকে মুক্ত করেছে। ২,অবিভক্ত বাংলার জনসংখ্যার গুনতিতে ৫৫ ভাগ ছিল মুসলমান ৪৫ ভাগ হিন্দু । যার ফলে কোন নির্বাচনে বাঙালি উচ্চবর্ন সমাজের লোক কেউ কোনদিন মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে গিয়ে বসতে পারতো না।বাংলাকে ভাগ করে মুসলমান সমাজের একটা বড় অংশ ওদিকে পড়ে যাওয়া, শিক্ষিত এবং আর্থিক দিকে থেকে এগিয়ে থাকা মানুষ তেমন একটা এপারে না থাকা, এতে উচ্চবর্ন বাবুদের পথের কাটা সরে গেছে। ৩, আর বরিশাল খুলনা ফরিদপুর যশোর এই চারটি নম মানুষ অধ্যুষিত জেলা ওপারে ঠেলে দেওয়ায় মাহার নম একতায় একটা দেওয়াল তুলে দেওয়ায় মনুবাদীদেরও আগামী দলিত আন্দোলন থেকে ভীত ত্রস্ত হওয়া থেকে মুক্তি মিলে গেল। বলা হয় মুসলমানরা চাইলো বলেই দেশভাগ হলো তা যদি হয় তাহলে মুসলমান অধ্যুষিত মুর্শিদাবাদ মালদা নদীয়া দিনাজপুর এমন জেলাগুলো এপারে রেখে দেওয়া কেন হয়েছিল? আর কেন বা বরিশাল ফরিদপুর খুলনা যশোর- হিন্দু নমো অধ্যুষিত এই জেলাগুলো ওপারে ফেলে দেওয়া হল? হলো কারন দলিত নেতা আম্বেদকরকে সংবিধান সভায় জিতিয়ে পাঠানোর এইভাবে বদলা নেওয়া হল নমদের উপরে । দেখার ব্যাপার এটাই, যখন ওপার বাংলা থেকে নম মানুষরা এপারে আসা শুরু করল তাঁদের কিন্ত কোন সরকার আর বাংলায় রাখার পক্ষে থাকেনি। উচ্চবর্নবাবুদের সরকার জমি জায়গা দিয়ে বাংলায় থাকার ব্যবস্থা করলেও নমদের পাঠানো হয়েছে আন্দামান দণ্ডকারন্য সহ ভারতবর্ষের আঠারোটা প্রত্যন্ত অঞ্চলে।যদি এদের বাংলায় থাকার ব্যবস্থা করা হোত যে উদ্দেশ্যে ওই চারজেলা ওপারে ফেলা হয়েছিল সেই উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়ে যেত। আবার নমরা একটা ঐক্যবদ্ধ জাতি হিসাবে মনুদাবীদের প্রতিস্পর্ধী হয়ে উঠত। এই যে এখন এসআইআর, সিএএ, এনআরসি, নিয়ে আসা হয়েছে, নানা রকম কাগজ দেখাবার শর্ত আরোপ করে নাগরিক অধিকার কেড়ে নেবার চক্রান্ত চালানো হচ্ছে এর পিছনেও সেই নম সমাজ, যার একটা অংশ মতুয়া, তাঁদের খন্ড বিখন্ড দুর্বল করার চেষ্টা শুরু করা হচ্ছে। নমরা কেউ চীন আমেরিকা আরব থেকে আসেনি। এই বঙ্গের মানুষ। বাংলাভাগ ওরা করেছে । এই ভাগের সময় কেউ তাঁদের মতামত জানতে চায়নি।আজ তাঁদের ওরা অনুপ্রবেশকারি বলছে, ঘুসপেটিয়া বলছে, তাঁদের ডিটেনশান ক্যাম্পে নিয়ে আটক করছে। আজ যদি ঐক্যবদ্ধভাবে এই অশুভ প্রচেষ্টাকে রুখে না দেওয়া যায় নম জাতির মানুষের সামনে ভয়াবহ বিপদ আসছে। এই বিপদের সময়ে সবাইকে আঁকড়ে ধরতে হবে বাবাসাহেব আম্বেদকরকে।ওঁরা বাবাসাহেবের সংবিধান সরিয়ে সেখানে মনুস্মৃতি বর্নিত ব্যবস্থা লাগু করতে চাইছে।সেটা করতে সক্ষম হলে একা নমরা নয় বিপদে পড়বে সমস্ত দলিত সমাজ। তাই আজ সমস্ত দলিত জাতিগুলোকে নমশূদ্র মানুষদের রক্ষায় পথে নামতে হবে। সেই সব মানবতাবাদী উচ্চবর্ন মানুষ তাঁদের ও পাশে পিছনে এসে দাঁড়তে হবে আশ্বস বিশ্বাস ভরসা জোগাতে। নমদের নিকেশ করার পর ওঁরা একে একে সমস্ত দলিত জাতিকেই নিকেশ করবে। আর এই সব কিছুর একমাত্র উদ্দেশ্য বাঙালি জাতিকেই দুর্বল কমজোর বিনষ্ট করে ফেলা। এই সার সত্যটা যিনি বুঝতে চাইছেন না হয় তিনি অজ্ঞ তা না হলে অন্ধ ভক্ত। সেই যেমন হাতি শিকারিরা জঙ্গলে যাবার সময়ে সাথে করে কয়েকটা প্রশিক্ষিত কুনকিহাতি নিয়ে যায়। যে কুনকিহাতি ভুলিয়ে ভালিয়ে অন্য হাতিরপালকে পাতা ফান্দার দিকে নিয়ে আসে। তেমনই মনুবাদীরা দলিত সমাজের মধ্যে থেকে কিছু কুনকি দালাল তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।যারা নানা রকম কথা বলে বোকা সরল সাদাসিদা নমদের মনুবাদীদের পাতানো ফাঁদের দিকে নিয়ে চলেছে। সমাজে এই কুনকি দালালেরা বড় ক্ষতিকারক প্রানী। এদের থেকেও সতর্ক থাকার খুব প্রয়োজন। আমার এইটুকু বলার ছিল, মানলে মানবে না মানলে তাঁর ভাগ্য সে জানে!

Comments

Popular posts from this blog

ধর্ম নিয়ে

Banglar atit